ডেকেয়ার ব্যাপারটা ইম্পরট্যান্ট মানছি।
তা বলে মোটে ছমাসে আমাকে দিয়ে এলো ডেকেয়ারে। কেরিয়ার নিয়ে একটু বেশি আদিখ্যেতা নয় কি?
কিন্তু আমি মায়ের ফরে। আমার এই টেম্পোরারি
ঘরকুনো এক্সিস্টেন্স কি লাইফলং চলবে নাকি।
তখন মা কোথায় চাকরি পাবে। দুম করে চাকরি
ছেড়ে আমার বাছা , আমার বাছা করে ল্যাপ্টালেপ্টি করবে আমার সাথে , আই ডোন্ট থিঙ্ক ইটস
এ কারেক্ট আইডিয়া। আমি প্রথমে বেশ রেগে গেছিলাম
যেদিন দিদা চলে গেলো আর আমাকে ডেকেয়ারে দেওয়া নিয়ে মা উঠে পরে লাগলো। বাবা তো গুড ফর নাথিং , পরে আছে বিদেশে। কিন্তু
পরে ব্যাপারটা একদিন রাতে মাথার ওপর হাত রেখে অন্ধকার সিলিং এ জ্বলে ওঠা ফ্লরোসেন্ট
চাঁদ তারা দেখতে দেখতে ভাবলাম। আমার এই একটু সাক্রিফাইসে মায়ের কত বড় লাভ হবে বলতো। বাবা ওখান থেকে আমায় বলে বীরপুরুষ। ওই 'মনে করো মা বিদেশ ঘুরে , মা কে নিয়ে যাচ্ছি
অনেক দূরে , ' ওই দাড়িওয়ালা দাদুর কবিতার ক্যারেক্টর আর কি। হাজার হোক বাবার বল ভরসা তো আমিই। ওনলি মেল পারসন ইন দা হাউস। আমিই যদি পিছু হতে যাই তাহলে কি হবে। বেচারি মা টা সারাদিন একবার আমায় খাওয়াবে আর আমি
হাগবো আর মা মুছবে। বাবা আবার ছড়া কাটে ,
'অনিরুদ্ধ বাগচী , কাপড় পরে হাগছি , কাপড় গেলো ধোপার বাড়ি, আবার হেগেছি।' নাঃ , মা
আমার হেব্বি স্ট্রং। বেত শক্ত হয়ে লাভ কি
, যদি না পেটানো যায় কাউকে।
সো , এলটন জনের স্যাক্রিফাইস। আমি রেডি হয়ে গেলাম। খুব একটা কনসেপ্ট ক্লিয়ার ছিল না ডেকেয়ারটা ঠিক কি ? কিন্তু এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে এটা একপ্রকার স্কুল। তাই একটা গর্বিত ভাব ছিল। বংশের সবথেকে কম বয়সে স্কুলে যাওয়ার রেকর্ড টা আমারি
থাকবে। একটু confused ছিলাম বটে। যে ওখানে গিয়ে করবো টা কি ফাইনালি। কিন্তু পৌঁছে দেখলাম কোনো চাপ নেই। হোম লাইক , আউট অফ হোম। আমার বাড়ি যে বিশাল বাড়ির মধ্যে সেরকম নয়। বেশ সুন্দর ছোট খাটো বাড়ি। আর আমাদের পাঁচ জনের জন্য একটা ঘর।
কেঁদেছি, কিন্তু বুঝতে দিইনি। মনে মনে, কারণ বয়েস ডোন্ট ক্রাই। মা যখন আমায় ছেড়ে চলে যেত। কেমন যেন বুক থেকে কান্না ডুকরে গলায় চলে আসতো।
সাথে মায়ের কাঁচুমাঁচু মুখ দেখে আরো কান্না পেতো।
মুখটা এমন করতো যেন পৃথিবীর সবথেকে বড় অপরাধ করছে। মা আমায় ছেড়ে দিয়ে গাড়িতে বেশ কিছুক্ষন বসে বসে
দূর থেকে আমায় দেখতো। আমি বুঝতে পারতাম। অতো
সোজা নয় , আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া। মা ভাবে আমার ভিশন অতো দূর পর্যন্ত যাবে না। মা
ঘর থেকে বেরোনোর পর আমি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতাম , যদি মা ফেরে। একদিন ফিরেওছিলো। সেদিন আমাকে বাড়ি থেকে খাইয়ে আনতে
পারেনি। মিটিং ছিল। খিদে পেয়েছিলো কিন্তু মায়ের হাতে খেতে ইচ্ছা করছিল। মনে মনে খুব বললাম আর দেখি কিছুক্ষনের মধ্যে ওই
দরজা দিয়েই মা আবার ঢুকলো। আমায় খাইয়ে দাইয়ে
ঘুম পাড়িয়ে কখন চলে গেলো জানিনা। তার পর থেকে
আমি আর দরজার দিকে বা গাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকি না। মা বেরোলেই , যত কষ্টই হোক না কেন আমি চোখ ঘুরিয়ে
বন্ধুদের দিকে করে নিই। মাও ধীরে ধীরে দেখলাম
অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বাবা , দেখলে , দিস ইস কল্ড
রেসপনসিবিলিটি।
উফ, সেনটু সেনটু। মোস্ট আনরিলায়বল ইমোশন। ব্যাথা খেয়ে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না। তাই আমি শুরু করলাম বাওয়ালি। নিজের জায়গা নিজে বানানো দরকার। আমার আগে সিনিয়ররা
আছে। দল বাঁধলাম জো এর সাথে। জো প্রথমে একটু ঘ্যাম নিয়েছিল বটে , ফর্সা চামড়া
তো। একটু নাকটা লম্বা। আমার বিশেষ কিছু এসে যায় না। নানা ধরণের খেলনা আছে
এখানে। কোনোটা টানা , কোনোটা ঘোরানো, কোনোটা
ছুঁড়ে ফেলা। তবে সবথেকে মজাদার খেলা হলো ,
জেসমিন আর হার্পারকে ঘুম থেকে তোলা। কি ঘুমোয়
রে মেয়েগুলো। জেসমিন আবার নাক ডাকে। যেই
না নাক ডাকার আওয়াজ পাই আমি বা জো। সোজা গিয়ে
ওদের ক্রিব ধরে নাড়াতে থাকি। আর চিৎকার করতে
থাকি। এই একটা সময় আমাদের। পুরুষ জাতির হুঙ্কার। কিন্তু কয়েকদিন পর কেসটা গন্ডগোল হয়ে গেলো। রোজ চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিই বটে , কিন্তু
জেসমিন উঠে কাঁদে না। আমার দিকে কেমন যেন তাকায়। তাকিয়েই থাকে।
জল মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলো যেদিন জেসমিন সোজা এসে আমার কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে পরে
চুলে হাত বোলাতে লাগলো, আর লুকাস আমার দিকে রাগে কটমট করে তাকাতে লাগলো। আমি কোনো রকমে জেসমিন কে ছাড়িয়ে লুকাসের দিকে হামা
দিয়ে গেলাম বোঝাতে। কিন্তু জেসমিন আমায় ছাড়লো
না , পেছন পেছন এসে আবার চুলে হাত বোলাতে লাগলো। লুকাস আমার দিকে পেছন ফিরে বসে পড়লো।
তিন দিন আমাদের মধ্যে কোনো কথা নেই। আমি অনেক কিছু বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু ও শুনলই
না। মেক্সিকান রক্ত তো। ওদিকে জো এই পুরো ব্যাপারটার মজা নিচ্ছে আর আমায় সাইড করে
দিব্বি হারপারের সাথে খেলছে। আমি ক্যাবলা
হয়ে শেষমেশ একদিন এসে ধপাস করে লুকাসের কোলে গিয়ে
বসলাম। লুকাস অবাক। সাথে আবার সেদিন ওর খুব সর্দি হয়েছে। নাক দিয়ে পোঁটা ঝরছে। আমি দেখলাম, না , ঘেন্না করলে হবে না। একটা মেয়ের জন্য বন্ধুত্ব জলে দিতে পারিনা। হাত বাড়িয়ে নাকটা মুছে দিলাম। জেসমিনা ওয়াক বলে
পেছনে ফিরে খেলতে লাগলো। আর লুকাস এসে জড়িয়ে
ধরলো। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা।
আর না, আর মেয়েদের কাছে ঘেঁষিনি। এরপর থেকে শুধু থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। আমরা সুখ দুঃখের গল্প করি। মানে পরনিন্দা পরচর্চা। কিন্তু ছেলেদের বেশি ইন্টারেস্ট অ্যাকশনে। আর সেটা না করতে দিলে যে ফ্রাস্ট্রেশান তৈরী হয়
তার ডিসকাশনই আমাদের মধ্যে বেশি হতো। তিন জনের
সম্বন্ধে কত কিছু জানলাম। সে গল্প অন্যদিন। তবে বাকি চারজনের সাথে আমার একটাই তফাৎ। সবাই সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ঢুকে পরে আর
পাঁচটার পরে যায়। আমার টাইম শর্ট। আমি বাড়ি থেকে খেয়ে দেয়ে টিফিন প্যাক করে আসি। টিফিনগুলো বেশ সুন্দর। একটাতে ফল থাকে, একটাতে জল , একটাতে খিচুড়ি , একটাতে
দুধ। বাইরে ঠান্ডা তো তাই এক্সট্রা জ্যাকেট
আর অনেক গুলো ডাইপার দিয়ে মা একটা বড়ো ঝোলা জেনেটের হাতে দিয়ে যায়। ও হ্যা জেনেটের কথা তো বলাই হয়নি।
জেনেট , ক্লারিসা আর এমি এই তিনটে আমার
চাকর। বেশি রুড হয়ে গেলো কি। আচ্ছা ঠিক আছে ইনজিরি তে বলছি কেয়ারটেকার। গু র থেকে পটি ভালো শোনায়। যাহোক এই তিন বুড়ি আমাদের খেয়াল রাখে। সময় সময় সব কিছু করে দেয়। মা কে কপি করার চেষ্টা করে। কিন্ত পারে না। জেনেটের সাথে আমার বেশি জমে কারণ ওর এন্টারটেইনমেন্ট
আমার হাসি , আমার টুথলেস ভুবনভোলানো হাসি।
আর আমার এন্টারটেইনমেন্ট জেনেটের বিচিত্র বানরসম অঙ্গভঙ্গি। আমরা বেশ উইন উইন সিচুয়েশনে ছিলাম। বাঁধ সাধলো আমার
শরীর।
কি জানি কি হতো , প্রত্যেক শুক্রবার বিকেলে
বাড়ি ফিরে , কি যে ঠান্ডা লাগতো। মা বলতো চি
চি করছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। তারপর জ্বর আসতো। শুক্র রাত্রি , শনি রাত্রি সারা রাত জ্বরে চি চি
করে রবিবার চাঙ্গা। ততদিনে মার বারোটা বেজে
যেত রাত জেগে জেগে। ডাক্তার ওজন টোজোন করে বললো আন্ডারওয়েট। শুনেই প্রথমে
বাবার মাংস কেটে আমাকে খাওয়ানো হলো। তারপর
মা এনালাইসিস করে বার করলো ব্যাপারটা অন্য।
আমি নাকি ডেকেয়ারে পর্যাপ্ত খাই না।
সে তো সত্যি খাইনা। ভালোই লাগে না। মা যেভাবে খাওয়ায় টিভির সামনে বসে , ডিসনি ষ্টার
ডার্লিং দেখতে দেখতে। সেটা এখানে খুব অভাব
ছিল। আমি আমার মর্জির মালিক। এই পৃথিবী ধন্য হয়ে গেছে আমি জন্মেছি বলে। আমি কেন অন্যের মতো চলবো। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দুধ খাই, আনপ্রোডাক্টিভ
কাজ ঘুমিয়েই করি । আমার নিজের টেবিল চেয়ার আছে। সাথে আবার মাঝে মাঝে বাবা বসে থাকে
ফোনের ওপার থেকে। মানে আমার খাওয়াটা হলো একটা
আর্টিস্টিক কাল্টিভেশন উইথ অল টাইপ অফ কেয়স এন্ড কসমস। খাবো ,বমি করবো , আবার খাবো। আই ডু ইট অন মাই টার্মস।
কিন্তু এইখানে ব্যাপারটা অন্য। নিয়মানুবর্তিতা , যাকে বলে ডিসিপ্লিন। বাঁ হাতের
কব্জি ঘুরিয়ে কি একটা দেখলো আর আমায় ধরে বসিয়ে মুখে ফল গুঁজে দিলো। আবার দেখলো , জলের বোতল গুঁজে দিলো। আবার দেখলো দুধ গুঁজে দিলো। আমিও সেয়ানা।
খেলামি না। সারাদিন কত কাজ। তার মধ্যে
ওইরকম জোর করে খাওয়ানো কি পোষায়। একাধারে ফোর্সিং
আর ইন্সাল্ট। আমি টোটাল রিভোল্ট মোডে চলে গেলাম।
সারভাইভালের জন্য তো মা আছে। বিকালে মা যেই
আসতো, গাড়িতেই আমি বাকি এক সাথে সারাদিনের খাবার খেয়ে নিতাম। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। জেনেট ব্যাপারটা ঠিক ভাবে নিলো না। শেষে মায়ের কাছে কমপ্লেন আসতে লাগলো। একদিন তো ইন্ডিরেক্টলি বলেই দিলো নিয়ে চলে যেতে। আমি পড়লাম মহা ফাঁপরে। একে প্রত্যেক উইকেন্ডে অসুস্থ , সাথে চোখের সামনে
বাবাকে চূড়ান্ত অপদস্ত করছে মা , সাথে মায়ের শরীর খারাপ হয়ে গেলো। আমি রোজ জেনেট কে বোঝানোর চেষ্টা করতাম , আমাকে
থাকতে দাও। অন্তত যে কাজ করতে এসেছি সেটা তো সমাধা করি। কিন্তু দেখলাম সবাই একে একে বেঁকে বসলো। নিজের ক্যালাস
ষ্টেপের জন্য আমি নিজেই নিজেকে ডিফেম করলাম।
ফার্স্ট স্টিং অফ রিয়ালিটি।
হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি মা হুটোপাটা
করে আমায় তুলে ড্রেস পরিয়ে কার একটা বাড়িতে দিয়ে এলো , আমি ঘুমের ঘোরে বেশি পাত্তা
দিলাম না। কিন্তু সেখানেও দেখি কিছুক্ষন পরে
আমাকে গাড়ি করে আমার ডেকেয়ারে দিয়ে এলো। বাড়িতে
যখন ফিরলাম তখন দেখি দাদু বসে আছে। আমি বুঝতে
পারলাম আমার ভবিতব্য। এখন না আছে জেসমিন ,
না আছে জেনেট , না আছে জো লুকাস হারপার। এখন
আমি আর দাদু , দাদু আর আমি। আর আছে একটা বাক্সের
ওপর আমার মতো আরেকজনের ছবি। রোজ কথা বলি এই
ভেবে , যদি কোনোদিন হঠাৎ করে পাল্টা জবাব দেয় , আর আমরা সুখ দুঃখের গল্প করতে পারি। .....